স্যাটেলাইট কি – স্যাটেলাইট এর কাজ, ব্যবহার, সুবিধা এবং অসুবিধা

স্যাটেলাইট কি ? (what is satellite in Bangla), আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা উপগ্রহ কি বা স্যাটেলাইট বলতে কি বুঝায় এই বিষয়ে সম্পূর্ণ বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করতে চলেছি। 

স্যাটেলাইট কি
স্যাটেলাইট কাকে বলে ?

এছাড়া, স্যাটেলাইট এর কাজ কি এবং স্যাটেলাইট এর সুবিধা গুলো কি কি, এই বিষয়েও আমরা আলোচনা করবো। 

আমাদের পৃথিবী থেকে মহাকাশ সমস্তটাই একটা গোটা রহস্যজালে আবৃত।

আবার এই মহাকাশের অভ্যন্তরে রয়েছে নানা ধরণের মহাজাগতিক বস্তু, তারই মধ্যে একটা বস্তু হল উপগ্রহ। 

এই উপগ্রহেরই ইংরেজি নামই হল “স্যাটেলাইট“।

আজকের আমাদের আর্টিকেলের আলোচনার বিষয় হল আসলে এই স্যাটেলাইট এর সংজ্ঞা কি, কি তার কাজ এবং এর সুবিধা ও অসুবিধা গুলোও বা কি কি ? 

আসুন প্রথমে জেনে নিই স্যাটেলাইট কথাটির আক্ষরিক অর্থ।

স্যাটেলাইট কি । স্যাটেলাইট-এর সংজ্ঞা

নাসা বা ন্যাশনাল এইরোনোটিক্স এন্ড স্পেস এডমিনিস্ট্রেশনের মতে, একটি উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট হল এমন একধরণের মহাজাগতিক বস্তু বা কৃত্রিম বস্তু যা একটি গ্রহ বা নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে সর্বদাই প্রদক্ষিণ করে। 

এই সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, এই উপগ্রহ কোনো চাঁদ, গ্রহ এমনকি কোনো মেশিনও হতে পারে যা নির্দিষ্টভাবে কোনো নক্ষত্র বা গ্রহকে আবর্তন করবে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যে চাঁদ হল পৃথিবীর একটি উপগ্রহ কারণ এটি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। 

তবে সাধারণত, “স্যাটেলাইট” শব্দটি এমন একটি মেশিনকে বোঝায় যা মানবজাতির দ্বারা সৃষ্টি করে তা মহাকাশে উৎক্ষেপণ করেছে এবং যা পৃথিবী বা মহাকাশের অন্য কোনো বস্তুর চারপাশে ঘোরে। 

তাই স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ বলতে আমরা বুঝি, তথ্য সংগ্রহ বা যোগাযোগের জন্য পৃথিবী বা চাঁদ বা অন্য গ্রহের চারপাশে কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করার জন্যে আমরা যেসব মেশিনগুলো মহাকাশে প্রেরণ করি তাইই হল এই স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ।

মানুষের দ্বারা প্রেরিত কৃত্রিম উপগ্রহ গুলো মূলত যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হয়।

বেশির ভাগ সময়ই এই স্যাটেলাইট গুলো টিভির সিগন্যাল প্রেরণ এবং সারা বিশ্বে ফোন কলের সিগন্যাল প্রেরণের কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। 

নাসার গণনা অনুযায়ী এখনও পর্যন্ত ২০-টারও বেশি উপগ্রহের একটি গ্রুপ গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা জিপিএস তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়।

আর, যদি আপনার কাছে একটি জিপিএস রিসিভার থাকে, তাহলে এই উপগ্রহগুলো  আপনার সঠিক অবস্থান নির্ণয় করতে সাহায্য করতে পারে৷

স্যাটেলাইট শব্দের অর্থ:

স্যাটেলাইট শব্দটি ইংরেজি শব্দ হিসেবে প্রচলিত হলেও, আসলে এটি একটি ফরাসি শব্দ এবং ল্যাটিন ভাষায় এই অর্থ হল অনুসরকারী। 

জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোহানস কেপলার ষোড়শ শতকে বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহগুলোর সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার সময় এই স্যাটেলাইট শব্দটি উচ্চারণ করেছিলেন। 

স্যাটেলাইটের প্রকারভেদ:

নাসার মত অনুযায়ী, স্যাটেলাইটে প্রধানত দুই ধরণের হয়ে থাকে; সেগুলো হল প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট স্যাটেলাইট। 

প্রাকৃতিক উপগ্রহের প্রধান উদাহরণ হল পৃথিবী এবং চাঁদ।

পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে আর চাঁদ প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীকে। 

এছাড়াও, আমাদের আকাশগঙ্গা সৌরজগতের মোট ১৭১টি চাঁদ বা প্রাকৃতিক উপগ্রহ রয়েছে।

এর মধ্যে পৃথিবীর ১টা, মঙ্গল গ্রহের ২টো, বৃহস্পতির ৬৬টা, শনির  ৬২টা, ইউরেনাসের ২৭টা এবং নেপচুনের ১৩টা উপগ্রহ আছে। 

অন্যদিকে, মানুষের তৈরি স্যাটেলাইট গুলো নানা ধরণের আকৃতি ও প্রকৃতির হয়ে থাকে।

এইগুলো মহাকাশে পাঠানো হয় বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষামূলক, তথ্য সংগ্রহমূলক ও সিগন্যাল ট্রান্সমিশনের এবং আরও নানা উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে। 

যেহেতু, আমাদের আলোচনার মুখ্য বিষয় হল কৃত্রিম বা মনুষ্যসৃষ্ট স্যাটেলাইট, তাই আমরা জেনে নেব, এই কৃত্রিম স্যাটেলাইট মোট কত ধরণের হয়ে থাকে।

বিভিন্ন ধরণের কৃত্রিম স্যাটেলাইট:

মনুষ্যসৃষ্ট উপগ্রহগুলোর প্রতিটার কাজ ও ধরণ একে অন্যের থেকে আলাদা হয়ে থাকে।

তাই তাদের কাজের ধরণ অনুসারেই মূলত তাদের শ্রেণীবিভাগ করা হয়ে থাকে। 

তাদের কাজের ভিত্তিতে গঠন ও ডিসাইন বেশিরভাগ সময়ই আলাদা হয়ে থাকে।

এই শ্রেণীবিভাগ অনুযায়ী আমরা মোট ৯ ধরণের কৃত্রিম স্যাটেলাইট দেখে থাকি, সেগুলো হল – 

১. কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট:

এইগুলো সাধারণত রেডিও টেলিকমুনিকেশন সিগন্যাল ট্রান্সপন্ডারের সাহায্যে পৃথিবীর এককোণ থেকে অন্যকোণে রীলে করে।

২. রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট:

রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট বা এয়ারক্রাফ্ট-ভিত্তিক সেন্সর প্রযুক্তি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণের সাহায্যে কোনোরকম শারীরিক স্পর্শ ছাড়াই পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ, বায়ুমণ্ডল এবং মহাসাগরের বিভিন্ন অংশের রাডার ইমেজ তুলতে সক্ষম।

এই স্যাটেলাইট গুলো ভূগোলবিদ্যা, জলবিদ্যা, বাস্তুবিদ্যা, আবহাওয়া, সমুদ্রবিদ্যা, হিমবিদ্যা, ভূতত্ত্ব এমনকি সেনাবাহিনীর নানা কাজে লাগে।

৩. গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম:

জিপিএস স্যাটেলাইট প্রধানত হল একটি ন্যাভিগেশন সিস্টেম স্যাটেলাইট, যা রিসিভারের মাধ্যমে ও নির্দিষ্ট অ্যালগরিদম ব্যবহার করে আকাশ, সমুদ্র এবং স্থলে থাকা মানুষ, জীব কিংবা জড় পদার্থের সঠিক অবস্থান, বেগ এবং সময় সম্পর্কে তুলনামূলক সঠিক তথ্য দিতে পারে।

সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীরা সকলেই জিপিএস ব্যবহার করে থাকে।

বিভিন্ন স্মার্টওয়াচ কিংবা স্মার্টফোনে আমরা জিপিএস রিসিভার বা বাটন দেখে থাকি।

৪. ড্রোন স্যাটেলাইট:

এটি একধরণের রোবট দ্বারা চালিত চালকবিহীন বিমান বা মহাকাশযান।

এই ধরণের স্যাটেলাইটের মুখ্য সুবিধা হল যে এইগুলো পুনর্ব্যবহারযোগ্য।

৫. গ্রাউন্ড স্যাটেলাইট:

এই ধরণের স্যাটেলাইট গুলো পৃথিবীর বুকেই থাকে এবং সিগন্যাল রিসিভার ও প্রেরক হিসেবে কাজ করে।

তাই স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন গুলো রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট থেকে আসা তথ্য গুলোকে সংগ্রহ ও স্ট্রিম করার জন্যে এই গ্রাউন্ড স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যবহারকারী এবং অ্যাপ্লিকেশনে পাঠিয়ে থাকে। 

তাই, একটা স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশনে বাধ্যতামূলকভাবে একটা রিসিভিং অ্যান্টেনা, একটি ফিড হর্ন, ওয়েভগাইড এবং রিসিভার থাকে।

আমরা বিভিন্ন রেডিও অফিস কিংবা টিভির অফিসের বাইরে এই ধরণের গ্রাউন্ড স্যাটেলাইট দেখে থাকি।

৬. পোলার স্যাটেলাইট:

এই ধরণের স্যাটেলাইট পৃথিবীর মেরু অঞ্চলগুলো পর্যবেক্ষণ করার জন্যে পাঠানো হয়।

এগুলো মেরু অঞ্চল বরাবরই পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে এবং পৃথিবীর চুম্বকীয় মন্ডল ও মেরুর আলু বা নর্থার্ন লাইটস-এর উপর নজর রাখে।

৭. ন্যানো, স্মল ও স্মার্ট স্যাটেলাইট:

ওজনের ভিত্তিতে নানা আকারের ছোট ও বড় স্যাটেলাইট হয়ে থাকে।

স্যাটেলাইট গুলো ১কেজির কম ওজনের থেকে শুরু করে ১০০০ কেজির উপর ওজনের হতে পারে। 

পৃথিবী থেকে দূরত্বের ভিত্তিতে স্যাটেলাইট বেশ অনেক রকমের হতে পারে। 

৮. জিওসেন্ট্রিক অরবিট টাইপ বা জিওসিনক্রোনাস স্যাটেলাইট:

যেসব স্যাটেলাইট পৃথিবীর ঘূর্ণন গতির সাথে সমতা বজায় রেখে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে, সেগুলোই হল জিওসেন্ট্রিক অরবিট টাইপ বা জিওসিনক্রোনাস স্যাটেলাইট। 

পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে দূরত্ব অনুযায়ী এই স্যাটেলাইটগুলো আবার তিন ধরণের হয়ে থাকে। 

ক. লো আর্থ অরবিট বা লিও:

এই কৃত্রিম উপগ্রহ পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ থেকে ১৬০ থেকে ২০০০ কিমি দূরত্বের মধ্যে অবস্থান করে। এইগুলো পৃথিবীর কক্ষপথের সমান্তরালে থাকে ও পৃথিবীর সব থেকে কাছে থাকায় এইগুলো সব থেকে ভালো পর্যবেক্ষণ করে থাকে।

মূলত, টেলিকমুনিকেশন ও ইন্টানেট পরিষেবা এই ধরণের স্যাটেলাইটের উপর নির্ভরশীল।

খ. মিডিয়াম আর্থ অরবিট বা এমইও:

এই ধরণের কৃত্রিম উপগ্রহের গতি খুব ধীর হয় আর পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ থেকে এগুলো ২০০০ কিমির উপরের দূরত্বে অবস্থা করে থাকে।

প্রধানত, জিপিএস স্যাটেলাইট এই ধরণের উপগ্রহের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

গ. জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট:

যে সমস্ত স্যাটেলাইট শুধুমাত্র 35,786 কিমি-এর খুব কাছাকাছি উচ্চতায় স্থির অবস্থায় বিচরণ করে, যা পৃথিবীর নিরক্ষরেখায় একটি দ্রাঘিমাংশের উপরে স্থির থাকে। 

স্থল পর্যবেক্ষকরা যখন এই ধরণের কৃত্রিম উপগ্রহ দেখেন, তখন আকাশে এদেরকে গতিহীন ও একটি নির্দিষ্ট স্থানে স্থিরভাবে দেখে থাকেন। 

এই স্যাটেলাইট গুলো পৃথিবীর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করে, সমুদ্রবিদ্যা এবং বায়ুমণ্ডলীয় স্তরকে পর্যবেক্ষণ করে পৃথিবীর পৃষ্ঠ এবং বায়ুমণ্ডলের দৃশ্যমান এবং ইনফ্রারেড চিত্র প্রদান করে থাকে। এই স্যাটেলাইটের ক্ষেত্রে এন্টেনা স্থির থাকে।

স্যাটেলাইট পৃথিবীর অ্যান্টেনা গুলিতে সংকেত পাঠাতে রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে যোগাযোগ করে।

অ্যান্টেনাগুলি তখন সেই সংকেতগুলি ক্যাপচার করে এবং সেই সংকেতগুলি থেকে আসা তথ্যগুলিকে প্রক্রিয়া করে। তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারে:

স্যাটেলাইট কিভাবে তথ্য পাঠায় ?

রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে স্যাটেলাইট সংকেতের মাধ্যমে পৃথিবীতে থাকা অ্যান্টেনা গুলোতে তথ্য প্রেরণ করে।

আর, অ্যান্টেনাগুলো তখন সেই প্রেরিত সংকেতগুলোকে গ্রহণ করে সেগুলোকে মানুষের বোধগম্য তথ্যে পরিণত করে। 

সেই তথ্যের মধ্যে থাকতে পারে কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য (যেমন স্যাটেলাইট তোলা ছবি), স্যাটেলাইটের বর্তমান অবস্থা এবং মহাকাশে সেই স্যাটেলাইটের অবস্থান সম্পর্কীয় তথ্য।

স্যাটেলাইট কি দিয়ে তৈরি হয় ?

স্যাটেলাইট যেহেতু মেটাল দিয়ে তৈরী যন্ত্রাংশ বিশেষ, সেই কারণেই এই ধরণের মহাকাশ গমনকারী যন্ত্রগুলো শক্ত ধাতু টাইটেনিয়াম অথবা আলমুনিয়ামের শঙ্কর ধাতু দিয়ে তৈরী হয়। 

স্যাটেলাইট সাধারণত সৌরশক্তি দ্বারা চালিত হয় বলে এতে শক্তিশালী সোলার সেল বা সৌরকোষ লাগানো থাকে।

এছাড়াও, এই যন্ত্রে থাকে ক্যাডমিয়াম ব্যাটারি ও পাওয়ার বাস। 

যেকোনো কৃত্রিম উপগ্রহতেই থাকে –

১. একটি অ্যান্টেনা,

২. একটি রেডিও ট্রান্সমিটার যে কম্যান্ড আপলিঙ্কিং কমান্ড ও তথ্য ডাউনলোড করার জন্য ব্যবহৃত হয়,

৩. একটি কম্পিউটার চিপ,

৪. একটি পাওয়ার সিস্টেম, (সৌরকোষ),

৫. একটি ব্যাটারি,

৬. একটি পাওয়ার বাস,

৭. এবং সেন্সর।  

ভারতে স্যাটেলাইটের ইতিহাস:

সর্বপ্রথম স্যাটেলাইট তৈরী করে ইতিহাসে নাম করেছে রাশিয়া। ১৭৫৭ সালের ৪ঠা অক্টবরে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম স্পুটনিক-১ নামের প্রথম মানবসৃষ্ট উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে।

এরপর আমেরিকার মতো আরও অনেক দেশ সফলভাবে কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠিয়েছে। 

তবে, অনেক বছর পর, ভারতের প্রথম উপগ্রহ ছিল আর্যভট্ট, যা সম্পূর্ণরূপে ভারতেই ডিসাইন ও তৈরী করা হয়েছিল।

এই প্রথম ভারতীয় উপগ্রহটি ১৯৭৫ সালে রাশিয়া থেকে সেখানকার একটি রকেট দ্বারা উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল।

বর্তমানে, ভারতের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৩৪২টি স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। 

স্যাটেলাইটের আপলিঙ্ক ও ডাউনলিঙ্ক কি ?

স্যাটেলাইট টেলিকমিউনিকেশনে যখন স্যাটেলাইটকে পৃথিবীর গ্রাউন্ড স্যাটেলাইট স্টেশন থেকে কোনো কম্যান্ড দেওয়া হয় তখন সেটা হল আপলিংক।

আর, যখন রিসিভারের সাহায্যে স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশনগুলোকে তথ্য পাঠায় বা রীলে করে তা হল ডাউনলিংক।

এই আপলিংক আর ডাউনলিংক পদ্ধতির সাহায্যেই আমরা স্যাটেলাইটের তথ্য পেতে বা পাঠাতে পারি।

স্যাটেলাইট এর কাজ কি ?

এই কৃত্রিম উপগ্রহের বেশ কতগুলো কাজ রয়েছে, সেগুলো হল –

১. স্যাটেলাইটের প্রধান কাজ হল বিরামহীনভাবে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করা এবং পৃথিবীর বাইরে ও মহাকাশে ঘটতে থাকা খুঁটিনাটি তথ্য সম্পর্কে পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের অবগত করা।

২. পৃথিবীর আবহাওয়া, বায়ুমণ্ডল, ও প্রতিটা ভৌগোলিক তথ্য ছবির আকারে বিজ্ঞানীদের পাঠানো।

রিমোট সেন্সিং-এর মধ্যে স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীর সমস্ত মহাসমুদ্র থেকে শুরু করে গভীর খাত সমস্ত কিছুরই রাডার ইমেজ ক্যাপচার করতে সক্ষম। 

৩. গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের সাহায্যে সামরিক শক্তি খুব সহজেই শত্রুদের গতিবিধির উপর সবসময় নজর রাখতে সক্ষম হচ্ছে।

৪. টিভি সিগন্যাল, রেডিও সিগন্যাল থেকে শুরু করে মোবাইল সিগন্যাল সমস্ত কিছুই প্রায় স্যাটেলাইট সিগনালিং-এর উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল।

৫. অনেক স্যাটেলাইটের মূল কাজ হল নিউক্লিয়ার মনিটরিং। 

স্যাটেলাইট এর ব্যবহার:

পৃথিবীতে মূলত তিনটি কাজের ক্ষেত্রে মানুষকে স্যাটেলাইটের ব্যবহারের উপর নির্ভর করতে হয়, সেগুলো হল –

১. আবহাওয়া:

আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী স্যাটেলাইট গুলো ক্রমাগত পৃথিবীর আবহাওয়ার সম্পর্কে তথ্য পাঠাতে থাকে এবং সারা বিশ্বের অসংখ্য তথ্য আমাদের কাছে ২৪ঘন্টা অবিরামভাবে রিপোর্ট করে।

এই তথ্য গুলোর মধ্যে থাকে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বাতাসের গতি এবং মেঘের ধরণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য।

আবহাওয়াবিদরা এই তথ্য ব্যবহার করে তাদের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে থাকেন। 

বিশেষ করে উন্নতমানের স্যাটেলাইট ব্যবহার করে মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটার অনেক আগে থেকেই মানুষজনকে সাবধান করে দেওয়া যাচ্ছে।

এর থেকে অনেক মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে।

২. যোগাযোগ ব্যবস্থা:

একটি যোগাযোগ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে খুব সহজেই পৃথিবীর এক স্থান থেকে থেকে অন্য স্থানে তথ্য রিলে করা সম্ভব হচ্ছে।

এই স্যাটেলাইট গুলি সাধারণত জিওসিঙ্ক্রোনাস হয়। 

অর্থাৎ, এই কৃত্রিম উপগ্রহ গুলো তাদের কক্ষপথে এমনভাবে ঘোরে যে তারা সর্বদা পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে চলে এবং পৃথিবীর উপর বরাবর একই স্থানে অবস্থান করে। 

এই উপগ্রহগুলো টেলিফোন সংকেত, মোবাইল যোগাযোগ, এবং জাহাজ থেকে উপকূল রেডিও পরিচালনা করে।

এছাড়াও, যোগাযোগ স্যাটেলাইটগুলো টেলিভিশন এবং রেডিও সংকেত সম্প্রচার পয়েন্ট থেকে সারা দেশের স্টেশনগুলিতে রিলে করে।

৩. অনুসন্ধান:

স্যাটেলাইটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহের অন্বেষণ করা।

এছাড়া, মানচিত্র তৈরি করতেও এই উপগ্রহের উপর বিজ্ঞানীরা অনেকটাই নির্ভর করে থাকেন। 

অনেক স্যাটেলাইটে উন্নতমানের ক্যামেরা থাকে যা গ্রহের পৃষ্ঠের স্থির ও ভিডিও ছবি পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের পাঠাতে সক্ষম।

ইনফ্রারেড ইমেজ, একদম সঠিকভাবে পৃথিবীর তাপ এবং ঠান্ডার জায়গা খুঁজে দিতে সক্ষমও বটে। 

তাছাড়াও, বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে পোলার আইস ক্যাপগুলির মতো দুর্গম জায়গায়গুলো শারীরিকভাবে না পৌঁছতে পারলেও, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সেই অঞ্চলগুলো ট্র্যাক করতে পারছেন।

এখনকার অন্বেষণকারী স্যাটেলাইট গুলো তারামন্ডলী ও নক্ষত্রের স্পষ্ট ছবি পাঠাতে সক্ষম যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের দ্বারা প্রভাবিত বা নষ্ট হয়ে যায় না।

স্যাটেলাইট এর সুবিধা:

স্যাটেলাইট কম্যুনিকেশনের বেশ কিছু সুবিধা আছে –

১. এই স্যাটেলাইট ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণটাই সৌরশক্তিতে চলে, তাই সীমিত শক্তির অপচয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই।

২. গ্রাউন্ড স্টেশনগুলো সহজেই পরিবহনযোগ্য। তাই বিপদের সম্ভাবনা দেখা গেলে খুব সহজেই সেই স্টেশনগুলোকে সরিয়ে নেওয়া যায়।

৩. স্যাটেলাইট ট্রান্সমিশন একসাথে অনেকটা ভৌগোলিক জায়গা কভার করতে পারে।

৪. ওয়ারলেস ও মোবাইল কমুনিকেশনে এই উপগ্রহের ব্যবহার খুব দ্রুত, নির্ভুল ও সহজ।

৫. বার্তা পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পাঠাতে এই মাধ্যম অনেকটাই কম ব্যয়সাপেক্ষ।

৬. স্যাটেলাইট ট্রান্সমিশনে নিরাপত্তা সাধারণত কোডিং এবং ডিকোডিং একুইপমেন্টের সাহায্যে প্রদান করা হয়, যে অনেকটাই সুরক্ষিত।

৭. এই ধরণের কমিউনিকেশন ব্যবস্থায় রক্ষণাবেক্ষণ অনেকটাই সহজ ও কম ব্যয়সাপেক্ষ।

স্যাটেলাইট এর অসুবিধা:

এই উপগ্রহ কম্যুনিকেশনে বেশ কয়েকটা অসুবিধাও রয়েছে –

১. স্যাটেলাইট যন্ত্রগুলো ডিসাইন করা, তৈরী ও সুরক্ষায় খরচ অনেকটাই বেশি।

২. এই যন্ত্রগুলোর মেরামতি ও রক্ষনাবেক্ষন সহজ নয়।

৩. এই যন্ত্রগুলোকে ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, যাতে এইগুলো কক্ষপথ থেকে সরে না যেতে পারে।

৪. অতিরিক্ত সূর্যের আলো ও প্রতিকূল আবহাওয়াতে স্যাটেলাইটের সিগনালে সমস্যা করতে পারে। 

 

আমাদের শেষ কথা,,

আমাদের আজকের স্যাটেলাইট নিয়ে লেখা আর্টিকেলটি এখানেই শেষ হল।

স্যাটেলাইট কি (what is satellite in Bangla), স্যাটেলাইট এর কাজ কি এবং স্যাটেলাইট এর সুবিধা গুলো কি কি এই নিয়ে লিখা আমাদের লেখাটা পড়ে ভালোলাগলে অবশ্যই তা কমেন্টের মাধ্যমে জানাবেন।

এছাড়া, আর্টিকেলের সাথে জড়িত কোনো ধরণের প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকলে সেটাও আপনারা কমেন্টের মাধ্যমে অবশই জানাতে পারবেন।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top
Copy link
Powered by Social Snap