ডিজিটাল ইন্ডিয়া কি । What Is Digital India in Bengali ?

ডিজিটাল ইন্ডিয়া কি (what is digital India in Bengali) : আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা ডিজিটাল ইন্ডিয়ার (Digital India) বিষয়ে সম্পূর্ণটা বিস্তারিত ভাবে জানতে চলেছি।

ডিজিটাল ইন্ডিয়া কি
ডিজিটাল ভারত মানে কি ?

ভারতে ইন্টারনেট পরিষেবা শহরাঞ্চলে অনেকটা বেশি উন্নত হলেও গ্রামীণ অঞ্চল গুলো এখনও সেরকমভাবে ইন্টারনেট পরিষেবার আলোকে আলোকিত হয়নি। 

ভারতের এই গ্রামীণ অঞ্চল গুলোতে ইন্টারনেট পরিষেবার মানোন্নয়নের জন্যে এবং সমস্ত সরকারি পরিষেবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রতিটা সাধারণ ভারতীয় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বর্তমান ভারতীয় সরকার একটি প্রকল্পের সূচনা করে, যা ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া‘ বা ‘ডিজিটাল ভারত‘ নামে পরিচিত।

আজকে আমাদের এই আর্টিকলে আমরা কথা বলবো এই ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্রকল্পটি নিয়ে। 

আপনারা এই আর্টিকেলের মাধ্যমে সবিস্তারে জানতে পারবেন ভারতীয় সরকারের দ্বারা প্রচলিত যুগান্তকারী এই সিদ্ধান্ত এবং প্রকল্প প্রনয়ণের ব্যাপারে। 

প্রথমে আসুন আমরা জেনে নিই, আসলে কি এই ডিজিটাল ইন্ডিয়া বা ডিজিটাল ইন্ডিয়া বলতে কি বুঝায়। 

ডিজিটাল ইন্ডিয়া কি ? (Digital India Meaning in Bengali)

এই Digital India হল ভারত সরকারের দ্বারা পরিকল্পিত একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম।

ভারত সরকারের লক্ষ্য হল এই প্রোগ্রামের সফল প্রনয়ণের মাধ্যমে এই দেশে ডিজিটাল ভাবে শক্তিশালী সমাজ এবং জ্ঞান অর্থনীতি গড়ে তোলা। 

এই প্রচারাভিযানের মূল লক্ষ্য হল সারা দেশে উন্নত অনলাইন পরিকাঠামো তৈরি করে ইন্টারনেট সংযোগ বাড়ানো। 

আর, উচ্চমানের ইন্টারনেট পরিষেবার সাহায্যে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশকে ডিজিটালভাবে ক্ষমতায়িত করে নাগরিকদের কাছে ইলেকট্রনিক ভাবে সরকারের পরিষেবাগুলিকে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই প্রকল্পটিকে বাস্তবায়িত করা হয়েছে।

কবে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার প্রচার শুরু হয় ?

২০১৫ সালের ১লা জুলাই বর্তমান ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের ঘোষণা করেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাক্য বা মোটো হল ‘পাওয়ার টু এমপাওয়ার‘, যার বাংলা অর্থ হল ‘ক্ষমতার ক্ষমতায়ন’। 

ডিজিটাল ইন্ডিয়া মানে কি ?

সোজা কথায়, ডিজিটাল ইন্ডিয়ার মানে হল ইন্ডিয়াকে ডিজিটালাইজ করে তোলা, অর্থাৎ, ভারতের সমস্ত সরকারি পরিষেবা যাতে ইন্টারনেটের সাহায্যে এই দেশের প্রতিটা জনগণ পায়, তার ব্যবস্থা করা। 

এই প্রকল্পের সাহায্যে ভারতীয় সরকারের লক্ষ্য রয়েছে সারা দেশে উন্নতমানের ইন্টারনেট পরিষেবার ব্যবস্থা করা এবং এর সাহায্যেই যাতে অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে নাগরিকরা সরকারি পরিষেবাগুলো সহজে পেতে পারে তার ব্যবস্থা করা।

ডিজিটাল ইন্ডিয়ার উদ্দেশ্য:

ভারত সরকার যখন এই প্রক ল্পের ঘোষণা করে, তখন এই প্রকল্প প্রনয়ণের ক্ষেত্রে তিনটি মূল দৃষ্টিভঙ্গির কথা প্রকাশ করে,

সেগুলো হল- 

১. প্রতিটি নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক ডিজিটাল পরিকাঠামোর ব্যবস্থা করা।

২. চাহিদা মতো দেশশাসন এবং পরিষেবা প্রদান।

৩. ডিজিটাল নাগরিকদের ক্ষমতাশালী করা।

১. প্রতিটি নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক ডিজিটাল পরিকাঠামোর ব্যবস্থা করা:

ভারত সরকারের এই প্রকল্পের প্রধান উদেশ্য গুলোর মধ্যে নাগরিকদের জন্যে যেসব সুবিধাগুলো দেওয়ার কথা বলে হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম উদেশ্যগুলো নিচে আলোচনা করা হল –

  • ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে উচ্চ-গতির ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করা।
  • জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটা ভারতীয় নাগরিকদের জন্যে অনলাইন, অনন্য, ও আমৃত্য-দরকারী ডিজিটাল পরিচয় তৈরী করে দেওয়া।
  • আর্থিক ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন এবং ডিজিটাল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সাহায্যে প্রতিটা নাগরিকদের অনলাইন ব্যাঙ্কিং-এ অংশগ্রহণ করতে সাহায্য করা।
  • একটি সাধারণ পরিষেবা কেন্দ্রে সহজ প্রবেশাধিকারের ব্যবস্থা করা।
  • ভারতীয় নাগরিকদের জন্যে অনলাইনে একটি পাবলিক ক্লাউড স্টোরেজে শেয়ার করা সম্ভব এমন ব্যক্তিগত ডিজিটাল স্পেস তৈরী করে দেওয়া।
  • দেশের প্রতিটা নাগরিক যাতে নিরাপদ সাইবার – স্পেস পায় তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

২. চাহিদা মতো দেশশাসন এবং পরিষেবা প্রদান:

ডিজিটালভাবে যাতে ভারতীয় সরকারি বিভাগগুলো নিজেদের মধ্যে সুস্থভাবে কার্য পরিচালনা করতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্রকল্পে সরকার কতগুলো স্পষ্ট উদ্দেশ্যের কথা ঘোষণা করেছে, সেগুলো হল-

  • ভারতীয় সরকারি বিভাগ এবং বিচার ব্যবস্থার মধ্যে কার্যকরী ডিজিটাল সম্পর্ক স্থাপন করে কাজের মধ্যে একতা, স্বচ্ছতা ও দ্রুততা নিয়ে আসা।
  • অনলাইন মাধ্যম এবং মোবাইল প্ল্যাটফর্মের সাহায্যে রিয়েল-টাইমে সরকারি পরিষেবা জনগণের জন্যে সহজলভ্য করে তোলা।
  • সমস্ত নাগরিক যাতে অনলাইন ক্লাউড স্টোরেজে সহজে প্রবেশাধিকার পায় সে বিষয়ে তাদেরকে অধিকার প্রদান করা।
  • সরকারি পরিষেবা গুলো যাতে সাধারণ মানুষ সহজে পেতে পারে সেই জন্যে এই পরিষেবা গুলোকে ডিজিটালভাবে রূপান্তরিত করা।
  • সমস্ত আর্থিক লেনদেনকে ইলেকট্রনিকভাবে নিরাপদ ও নগদহীন করে তোলা।
  • জিওগ্রাফিকাল ইনফরমেশন সিস্টেম (GIS) ব্যবহার করে অনলাইন পরিষেবার মানকে উন্নত করা।

৩. ডিজিটাল নাগরিকদের ক্ষমতাশালী করা:

ভারতীয় ডিজিটাল নাগরিকরা যাতে সেরা পরিষেবা ভোগ করতে পারে, সেই কারণেও ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্রকল্পে তাদের স্বার্থের কথা ভেবে, বেশ কতগুলো উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে,

সেগুলো হল-

  • সমস্ত নাগরিককে ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যাপার গুলোতে শিক্ষিত করে তোলা।
  • সমস্ত ডিজিটাল তথ্য গুলোকে পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে বসে অ্যাক্সেস করার ক্ষমতা দেওয়া।
  • সমস্ত সরকারী নথি/শংসাপত্র গুলোকে অনলাইন ক্লাউড স্টোরেজে উপলব্ধ করা।
  • সমস্ত ভারতীয় ভাষা গুলোতে ডিজিটাল সম্পদ বা পরিষেবা গুলো উপলব্ধ করা।
  • অংশগ্রহণমূলক দেশশাসনের উদ্দেশ্যে সহযোগিতামূলক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবস্থা করা।
  • ক্লাউড স্টোরেজের মাধ্যমে ব্যক্তিদের জন্য সমস্ত সরকারি দলিল ডিজিটালভাবে যেকোনো সময় অ্যাক্সেস করার ক্ষমতা দেওয়া।

ডিজিটাল ইন্ডিয়ার লাভ কি কি ?

ভারত সরকার যখন এই প্রকল্পটি আনে, তখন এই প্রকল্পের কি কি লাভ হবে, সেই বিষয়েও তারা পর্যালোচনা করে। 

এই ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্রকল্পের বেশ কিছু লাভজনক দিক অবশই রয়েছে,

সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি প্রয়োজনীয় লাভের করা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হল –

১. ব্ল্যাক ইকোনমি বা কালো অর্থনীতির অপসারণ:

সমস্ত অনলাইন লেনদেন সহজে নিরীক্ষণ করা সম্ভব এবং আর অনলাইন পেইমেন্ট হলে যেকোনো গ্রাহকের পাঠানো প্রতিটা পেইমেন্টের রেকর্ড চিরকাল থেকে যাবে। 

যার ফলে, কোনোরকম অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ আগের থেকে অনেকটাই কমবে এমনটা আশা করা যায়। 

অন্যদিকে, নগদ-ভিত্তিক লেনদেন কমিয়ে এনে শুধুমাত্র ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহার করে সরকার অনেক বেশি দক্ষতার সাথে ব্ল্যাক ইকোনোমিক দমিয়ে রাখতে অনেকটা সক্ষম হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

২. রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে:

ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্রকল্পের আরেকটি বড় সুবিধা হল এই যে, লেনদেনগুলি ডিজিটাইজড হওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় এবং কর নিরীক্ষণ করা আরও সুবিধাজনক হয়ে উঠবে। 

আর, লেনদেন রেকর্ড করার সাথে সাথে গ্রাহকরা এখন তাদের প্রতিটি কেনাকাটার জন্য একটি করে ডিজিটাল বিল পেয়ে যাবেন।

যার ফলে অসাধু ব্যবসায়ীদের অসাধু ব্যবসার হাত থেকে গ্রাহকরা নিশ্চিতভাবে বাঁচতে পারবেন। 

ডিজিটাল মাধ্যমে কর ফাঁকি দেওয়া এক কথায় প্রায় অসম্ভব। 

তাই, সঠিকভাবে সরকারকে কর প্রদানের ফলে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির একটা ভালো সম্ভাবনা তৈরী হতে পারে আর এই রাজস্ব বৃদ্ধির ফলে দেশের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থাও বেশ কিছুটা উন্নত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

৩. নাগরিকদের ক্ষমতায়ন:

এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল যে, এটি নাগরিকদের ডিজিটালভাবে শক্তিশালী করে তুলতে উৎসাহিত করে। 

যখন টাকার লেনদেন ডিজিটাল হয়ে যায়, তখন প্রত্যেকটি মানুষের কাছে একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল থাকাটা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে ৷

আর তখন সরকার সহজেই মানুষের আধার-সংযুক্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি ভর্তুকি স্থানান্তর করতে সক্ষম হয় ৷ 

তাই, নাগরিকদের আর সরকার থেকে প্রণোদনা কিংবা ভর্তুকি পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। 

এই ব্যবস্থাটি ভারতের বেশিরভাগ শহরে ইতিমধ্যেই শুরু করে দেওয়া হয়েছে, যার স্পষ্ট একটি উদাহরণ হল – এলপিজি ভর্তুকি, যা সরকার সাধারণ মানুষকে এতদিন দিয়ে এসেছে। 

এই ভর্তুকির অর্থপ্রদান সরাসরি এখন ব্যাঙ্ক ট্রান্সফারের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে।

৪. ই-গভর্নেন্সের ব্যাপক সুবিধা:

ই-গভর্ন্যান্স হল সমস্ত ভারতীয় নাগরিকদের জন্য যথেষ্ট সাহায্যকারী ব্যবস্থা।

যা পুরোনো দিনের শাসনের তুলনায় অনেকটাই দ্রুত এবং নিরাপদ।

ই-গভর্ন্যান্সের সাহায্যে আপনি খুব সহজেই অনলাইন মাধ্যম থেকে জন্ম শংসাপত্র থেকে শুরু করে মৃত্যু শংসাপত্র কোনোরকম অসুবিধা ছাড়া পেয়ে যেতে পারেন। 

এই ব্যবস্থাটি অত্যন্ত সুবিধাজনক, কারণ জনগণেরা তাদের প্রয়োজন মতো যখন খুশি, যেখানে ইচ্ছে তাদের নথিপত্র অনলাইন মাধ্যম থেকে পেয়ে যেতে পারছেন। 

৫. নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা:

ডিজিটাল ইন্ডিয়ার উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার নতুন বাজারে কাজের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। 

তার পাশা পাশি, বর্তমান বাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোরও অনেক উপায় বার করার চেষ্টা চালাচ্ছে, যাতে নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান বাড়ে।

এই ডিজিটাল ভারত প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হল ভারতের সরকারি বিভাগগুলোকে একত্রিত করে সর্বাঙ্গীনভাবে ভারতীয় জনগণকে ডিজিটাল স্বাক্ষরতা দান করে তাদের জন্যে একটি সুন্দর ডিজিটাল ইন্ডিয়া তৈরী করা। 

যেখানে তথ্য প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশ ও দশের ভবিষ্যৎকে সুনিশ্চিত করে তোলা সম্ভব।

আমাদের শেষ কথা,

তাহলে বন্ধুরা, আমাদের আজকের ডিজিটাল ভারত নিয়ে লেখা আর্টিকেলটি এখানেই শেষ হল। 

ডিজিটাল ইন্ডিয়া মানে কি (what is digital India in Bangla), নিয়ে লিখা আর্টিকেলটি ভালোলাগলে অবশ্যই সোশ্যাল মিডিয়া সাইট গুলোতে শেয়ার করবেন। 

এছাড়া, আর্টিকেলের সাথে জড়িত কোনো ধরণের প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকলে, নিচে কমেন্ট করে অবশই জানিয়ে দিবেন।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top