বর্তমানে ফেসবুক হ্যাক হওয়ার কয়েকটি সাধারণ কারণ !

ফেসবুক হ্যাক হওয়ার কারণ: বর্তমান সময়ে আট থেকে আশি প্রায় প্রত্যেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খুলে বসে আছে। মূলত পরিচিত ব্যক্তিদের পাশাপাশি সারা বিশ্বের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে আপ-টু-ডেট থাকার জন্যই অধিকাংশ মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরেছে।

এক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির মধ্যে ফেসবুক সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। কেননা ফেসবুক মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখার সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি বিনোদনমূলক কনটেন্ট দেখার বিকল্পও অফার করে।

কিন্তু ফেসবুক সহ অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম যদি আপনি সতর্কতার সাথে ব্যবহার না করেন, তাহলে পরিণাম ভয়ানক হতে পারে। এমনকি আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে একজন হ্যাকার লোক ঠকানোর কাজ করা থেকে শুরু করে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত খালি করে দিতে পারে।

ফেসবুক হ্যাক হওয়ার কয়েকটি সাধারণ কারণ:

ফেসবুক হ্যাক হওয়ার কারণ
ফেসবুক হ্যাক হওয়ার কারণ গুলো কি কি ?

আপনি হয়তো প্রতি নিয়ত এমন কয়েকটি সাধারণ ভুল করতে থাকছেন যেগুলির কারণে যেকোনো সময়ে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে যেতে পারে। তাই ফেসবুক ব্যবহার করার সময়ে কয়েকটি প্রাথমিক বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত।

আপনার যদি এই বিষয়ে জ্ঞান না থেকে থাকে, তবে আমাদের এই প্রতিবেদন থেকে কোন কোন কারণে ফেসবুক হ্যাক হতে পারে এবং হ্যাকারের হাত থেকে নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন সেই সম্পর্কিত কয়েকটি কৌশল জেনে নিতে পারেন।

ফিশিং (Phishing):

সার্ভে বলছে, বেশিরভাগ ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ফিশিং পদ্ধতি অবলম্বনে হ্যাক হয়। হয়তো আপনাদের মধ্যে অনেকেই ‘ফিশিং’ শব্দটির সাথে পরিচিত নন।

তাই আপনাদের বোঝার জন্য বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করি।

ফিশিং টেকনিকের মাধ্যমে, হ্যাকার প্রথমে ফেসবুকের ন্যায় হোম পেজের অনুরূপ দেখতে একটি নকল ওয়েব পোর্টাল তৈরি করে।

তারপরে, আপনাকে লগ ইন করতে বলে একটি ইমেল পাঠায়।

আর আপনি যেই ইমেলের মারফত পাঠানো লিঙ্কে ক্লিক করে আপনার ইমেল আইডি এবং পাসওয়ার্ড এন্টার করে ফেসবুকে লগ ইন করার প্রচেষ্টা করবেন, তখনই আপনার যাবতীয় ব্যক্তিগত তথ্যের বিশদ চলে যাবে সরাসরি নেপথ্যে থাকা হ্যাকারের হাতে।

এই তথ্যগুলিকেই ভবিষ্যতে ব্যবহার করে হ্যাকার আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে দিতে পারে।

কী-লগিং (Key-logging):

কী-লগিং হল একটি বিপজ্জনক ভাইরাস, যা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফোল্ডারে এমন ভাবে লুকিয়ে থাকে যে একজন প্রযুক্তি সম্পর্কে বিজ্ঞ ব্যক্তিও অনেক সময় তা সনাক্ত করতে পারেন না।

কার্যকারিতার কথা যদি বলি, কী-লগার প্রোগ্রাম যদি আপনার কম্পিউটার, ট্যাবলেট বা মোবাইলে ইনস্টল হয়ে যায়, তবে আপনি সেই ডিভাইসে যা যা টাইপ করবেন তা রেকর্ড করে নেওয়া হবে।

আর পরবর্তীতে সমস্ত তথ্য ইমেল -এর মাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়া হয় হ্যাকারের কাছে।

এক্ষেত্রে চুরি হওয়া তথ্যের মধ্যে – ফেসবুক সহ যাবতীয় সোশ্যাল মিডিয়ার পাসওয়ার্ড, ব্যাঙ্কিং বিশদ এবং অন্যান্য গোপনীয় তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

ফলে কী-লগিং অ্যাটাকের মাধ্যমে পাওয়া যাবতীয় তথ্য ব্যবহার করে একজন হ্যাকার খুব সহজেই আপনার পরিচয় চুরি করে অসৎ কাজে লিপ্ত হতে পারে।

স্টোরড পাসওয়ার্ড (Stored Passwords):

মোবাইল হোক বা ল্যাপটপ, যেকোনো ডিভাইস থেকে ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লগ ইন করার সময়ে পাসওয়ার্ড সেভ বা সংরক্ষণ করার অনুমতি চায় ডিভাইসটি।

যদি আপনার ডিভাইসও এই একই প্রস্তাব দিয়ে থাকে, তবে ভুলেও পাসওয়ার্ড সেভ রাখার অনুমতি দেবেন না।

দেখতে গেলে এই ফিচারটি ব্যবহার করে আপনি চটজলদি নিজের অ্যাকাউন্টে লগ ইন করতে পারবেন।

কিন্তু বিপরীতে, এমনটা করলে নিরাপত্তা জনিত সংকট দেখা দিতে পারে।

তাই পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ করার পরামর্শ আমরা একদমই দেব না।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ৮০% ফেসবুক ব্যবহারকারী পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ করার অনুমতি দেয়।

এমনটা করা যথাযথ নয় কারণ, কেউ যদি আপনার পাসওয়ার্ড ম্যানেজার হ্যাক করে নিতে সক্ষম হয়, তাহলে ডিভাইসে সংরক্ষিত যাবতীয় তথ্য সেই অসৎ ব্যক্তির হাতের নাগালে চলে আসবে।

শুধু তাই নয়, সেই সকল তথ্য ব্যবহার করে আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে বিভিন্ন প্রকারের অবাঞ্চিত কাজকর্মও করতে পারে হ্যাকাররা।

সাইডজ্যাকিং (Sidejacking):

বিনামূল্যে ইন্টারনেট কানেকশন পেলে কে না খুশি হয়!

কিন্তু এই সাময়িক খুশি আপনার পরবর্তী দিনগুলিকে বেদনাদায়ক করে তুলতে পারে।

বিষয়টা একটু খুলে বলি তাহলে।

রেস্তোরা, শপিং মল বা রেল স্টেশন জাতীয় কোনো জায়গার পাবলিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করার দরুন সাইডজ্যাকিংয়ের কবলে পড়তে পারেন আপনি।

সাইডজ্যাকিং অ্যাটাকে, হ্যাকার একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আপনার ডিভাইস অ্যাক্সেস চুরি করে।

এই ব্রিচ হ্যাকারকে ডিভাইস হ্যাক করার সময়ে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে আপনার ছদ্মবেশ ধারণ করার অনুমতি দেয়।

এই ধরণের হ্যাকিং টেকনিক – সেশন হাইজ্যাকিং বা কুকি হাইজ্যাকিং নামেও পরিচিত।

তাই পাবলিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা কালীন বিশেষ সতর্ক থাকুন।

আমাদের পরামর্শ, পাবলিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ফেসবুক বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে ভুলেও লগইন করবেন না, তাহলেই কিন্তু পড়তে হবে সাইডজ্যাকিংয়ের ফাঁদে।

ফেসবুকে নিরাপদ থাকার উপায়:

কিভাবে নিজের ফেসবুক একাউন্ট নিরাপদ রাখতে পারবেন তার কিছু কার্যকর উপায় গুলো নিচে বলে দেওয়া হলো। এগুলো অবশই অনুসরণ করুন।

১. অ্যাকাউন্টের লগ-ইন তথ্য শেয়ার করবেন না :

সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলের ব্যবহৃত ইমেল আইডি বা পাসওয়ার্ড কখনোই কারোর কাছে প্রকাশ করবেন না। আর চেষ্টা করবেন সর্বদা নিজের ডিভাইসেই ফেসবুক পরিচালনা করতে।

যদি একান্তই অন্যের মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করে লগ ইন করার প্রয়োজন পরে, তবে বিশ্বস্ত কারোর ডিভাইস ব্যবহার করুন।

কেননা আপনি যদি অপরিচিত কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানির ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস থেকে ফেসবুক ওপেন করেন, তবে আপনার দ্বারা এন্টার করা ইমেল আইডি এবং পাসওয়ার্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেভ হয়ে যেতে পারে সেই ডিভাইসে।

তাই ব্যক্তিগত তথ্য কারোর সাথে শেয়ার করার আগে নিজে নিশ্চিত হন যে সেই ব্যক্তিটি বিশ্বাসযোগ্য কিনা।

২. অনন্য পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন :

অনেক সময় আমরা জনবহুল কোনো জায়গায় নিজেদের মোবাইল থেকে ফেসবুকে লগ ইন করে থাকি।

দেখতে গেলে এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা।

কিন্তু একটু অসতর্কতার জন্য কিন্তু ঘটে যেতে পারে অঘটন! কারণ অনেক সময় আমাদের আশেপাশে থাকা অপরিচিত ব্যক্তিরা আমাদের গতিবিধির উপর নজর রাখে।

এদের মূল উদ্দেশ্যই হয় সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড চুরি করা।

তাই সর্বদা এমন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন যেটা অনুমানের অযোগ্য।

সাথে পাসওয়ার্ড এন্টার করার সময় একটু আড়ালও করে নিন ডিভাইসকে।

৩. ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করার সময়ে সতর্ক থাকুন :

ফেসবুকে শুধুমাত্র এমন ব্যক্তিদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টই অ্যাকসেপ্ট করুন যাদের আপনি বাস্তব জীবনেও চেনেন।

কেননা কিছু ব্যক্তি প্রথমে বন্ধু সেজে আপনার প্রোফাইলে প্রবেশ করে, তারপর আপনার দেওয়া ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার করে অসৎ কর্মে লিপ্ত হতে পারে।

যেমন – ফেক প্রোফাইল তৈরী করা, আপনি সেজে টাকা ধার করা, কেউকে হুমকি দেওয়া ইত্যাদি কাজ করতে পারে।

তাই পরিচিত মানুষ ব্যতীত অন্যদের রিকোয়েস্ট গ্রহণ না করাই ভালো।

এতে আপনারই ফেসবুক অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত থাকবে।

৪. লিঙ্ক ক্লিক করাকালীন সতর্ক থাকুন :

ফেসবুকের ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা কোনো অপরিচিত বা পরিচিত ব্যক্তি যদি আপনাকে কোনো লিংক পাঠায়, তবে তাতে ক্লিক করার আগে সতর্ক হয়ে যান এবং সেই লিঙ্কটি আদৌ যথাযথ কিনা যাচাই করুন।

ফেসবুকের কোনো পোস্ট শেয়ার করা হলে, সেটির URL -এ কিন্তু “facebook.com” থাকে।

কিন্তু যদি URL -এ “www.facebook33.tk” বা “www.facebook1.php” লেখা দেখেন, তবে সেই লিঙ্ক এড়িয়ে যান।

কারণ এরূপ ফিশিং লিঙ্ক প্রেরণের মাধ্যমে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করার চেষ্টা করতে পারে হ্যাকার।

এছাড়া কোনো URL -এ যদি “http://” লেখা না থাকে, তবে সেই লিঙ্কেও ক্লিক করবেন না।

এইধরণের লিঙ্ক আপনাকে ফিশিং ওয়েবসাইটে নিয়ে ফেলবে।

৫. মোবাইল যেখানে সেখানে ফেলে রাখবেন না :

যত্রতত্র মোবাইল বা ল্যাপটপের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিভাইস ফেলে রাখবেন না।

বিশেষত আপনি যদি নিজের ডিভাইসে কোনো পাসওয়ার্ড ব্যবহার না করেন, তবে আরোই সতর্ক থাকা উচিত।

কেননা আপনার অবর্তমানে ডিভাইসে সংরক্ষিত তথ্য চুরি করে নিতে পারে কোনো অপরিচিত ব্যক্তি।

আর তারপর ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা এমন কোনো কঠিন কাজ হবে না।

৬. পাবলিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করার থেকে বিরত থাকুন :

ভুলেও পাবলিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ফেসবুকে লগ ইন করবেন না।

কেননা ক্যাফে বা শপিং মলের ফ্রি ওয়াই-ফাই করার জন্য আপনার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট সহ ফোনে থাকা বাদবাকি তথ্যাদিও হ্যাকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। কারণ পাবলিক নেটওয়ার্ক একসাথে অনেকে ব্যবহার করে থাকে।

ফলে কেউ যদি পাবলিক নেটওয়ার্ক সিস্টেমে ম্যালিসিয়াস কোড ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়ে যায়, তাহলে সেই ওয়াই-ফাই ব্যবহারকারী সকল ব্যক্তির ডিভাইস হ্যাক হয়ে যেতে পারে।

তাই ফ্রি ইন্টারনেট ব্যবহারের লোভে একদমই পড়বেন না।

৭. Two-factor authentication

আপনার ফেসবুক একাউন্টের Security and login settings-এর পেজে দেখতে পাবেন two-factor authentication নামের একটি অপসন।

এই অপশনটি অবশই চালু (enable) রাখতে হবে।

এতে, যখনি আপনার ফেসবুক একাউন্টে কোনো নতুন ডিভাইস থেকে লগইন করার চেষ্টা করা হবে,

তখন, আপনার একাউন্টের সাথে সংযুক্ত mobile number এর মধ্যে একটি verification code চলে আসবে।

আর এই code ছাড়া কেও আপনার ফেসবুক একাউন্টে লগইন কখনোই করতে পারবেননা।

আপনার একাউন্ট আইডি পাসওয়ার্ড যদি কারোকাছে থেকেথাকে তাও সে আপনার ফেসবুকে লগইন বা প্রবেশ করতে পারবেনা।

তাই, অবশই নিজের Facebook account settings এর মধ্যে গিয়ে two-factor authentication অপসন চালু করুন।

তাহলে বন্ধুরা, বর্তমান সময়ে একটি ফেসবুক একাউন্ট হ্যাক হওয়ার মূল কারণ গুলো কি কি সেগুলো বুঝতেই পেরেছেন হয়তো।

ফেসবুক হ্যাক হওয়ার কারণ গুলো নিয়ে লিখা আমাদের আজকের আর্টিকেলটি ভালো লেগে থাকলে, নিচে কমেন্ট করে জানাবেন।

অবশই পড়ুন:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top